হ্যান্টাভাইরাস কি পরবর্তী মহামারির মুখ?
আটলান্টিকের বুকে একটি প্রমোদতরীতে তিনটি মৃত্যু, ১১টি দেশে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক — আর জলবায়ু পরিবর্তনের হাত ধরে ক্রমশ বিস্তৃত হওয়া এক নীরব ঘাতক ভাইরাসের পদধ্বনি। ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি প্রস্তুত?

হ্যান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুর ও মূষিকজাতীয় প্রাণীর মলমূত্র ও লালা থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় এবং ফুসফুস ও কিডনিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
১ এপ্রিল, ২০২৬। আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে ডাচ প্রমোদতরী MV হন্ডিউস ২৩টি দেশের ১৪৭ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে রওনা দেয় গন্তব্য আন্টার্কটিকার দিকে | তবে এই যাত্রা ধীরে ধীরে পরিণত হয় এক ভাসমান দুঃস্বপ্নে | মে মাসের শুরুতে হঠাৎই একের পর এক যাত্রী আক্রান্ত হয়ে জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসের প্রদাহে | ৬ মে WHO এই রোগের লক্ষণ নিশ্চিত করে - ভাইরাসটি হ্যান্টাভাইরাসের অ্যান্ডেস স্ট্রেইন। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৩ জনের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভাইরাস, তাছাড়া প্রায় ১১ জন আক্রান্ত| চিন্তার বিষয় হলো যে আক্রান্তরা ছড়িয়ে পড়েছেন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর-সহ ১২টিরও বেশি দেশে।
প্রশ্নটি হলো যে, কি এই হ্যান্টাভাইরাস? এটির সংক্রমণ কতটা ভয়াবহ এবং এর মৃত্যুর হার কতটা? বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যান্টাভাইরাস নতুন নয় তবে এই মুহূর্তে এটি নতুন ভাবে বিপদজনক- কারণ অ্যান্ডেস হ্যান্টাভাইরাস সংক্রমণ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত | শুরুতে হতে পারে জ্বর, মাথাব্যথা , পেশিতে বেথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি - যেটিকে সহজেই ডেঙ্গু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা বলে ভুল ধরা যায় |
কিন্তু মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হয় হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, ফুসফুসে জল জমা এবং কিডনি বিকল — যাকে বলে Hantavirus Pulmonary Syndrome (HPS)। চিন্তার বিষয় হলো যে মৃত্যুহার প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ, এবং কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো নেই। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন যে এশিয়া ও ইউরোপে এই ভাইরাসের যে স্ট্রেইন পাওয়া যায়, তা মূলত কিডনিকে আক্রমণ করে। বন্যাপ্রবণ এলাকা, গ্রামীণ কৃষিজমি আর ঘিঞ্জি শহরতলী — এই তিন পরিবেশেই ভারতের সর্বাধিক মানুষ বাস করেন, যা সম্ভাব্য সংক্রমণের আদর্শ পরিবেশ। এবং এক্সপোজারের পর ৪ থেকে ৪২ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেওয়ায় রোগ শনাক্তকরণও কঠিন।

হ্যান্টাভাইরাসের লক্ষণ এবং সংক্রমণ
তবে কি এই হ্যান্টাভাইরাস ফিরিয়ে আনতে চলেছে ২০২০ সালের সেই ভয়াবহ সময় কে? এখনো পর্যন্ত জানা গেছে যে CDC এটিকে 'লেভেল-৩' জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দিয়েছে | ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ড. শার্লোট হ্যামার, জানাচ্ছেন যে, COVID-এর সঙ্গে তুলনা করে আমাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে তবে এটি একটি ভিন্ন ভাইরাস | কিন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইঁদুরের আবাসস্থল যেভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে, তাতে এই ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টিকে উপেক্ষা করা বোকামি হিসেবেই গণ্য হবে।
প্রশ্নটা এখানে আরও গুরুতর হয়ে দাড়ায়ে যে ভারতের কাছে এই ভাইরাস এর হুমকি কতটা চিন্তার বিষয়- সেই ক্ষেত্রে, আপাতত এটা জানা গেছে যে ভারতের জন্য সরাসরি হুমকি এখনো নিশ্চিত নয় - তবে আশঙ্কার কারণ যথেষ্ট | ICMR-NIV-এর পরিচালক ড. নবীন কুমার জানিয়েছেন, এখনো ভারতে কোনো কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের প্রমাণ নেই, তবে জাহাজে দুজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন বলে সরকার নজরদারি বাড়িয়েছে।
২০২১ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ হ্যান্টাভাইরাসকে ভারতে একটি 'অবহেলিত উদীয়মান সংক্রমণ' বলে চিহ্নিত করেছিল। বাস্তবতা হলো, ভারতের বন্যা-বিধ্বস্ত এলাকা, বস্তি অঞ্চল এবং কৃষিজমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইঁদুরের ঘনত্ব এবং মানব-ইঁদুর সংযোগ প্রচুর। একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: ভারতে আজ এই ভাইরাস ধরা পড়লে, সিংহভাগ চিকিৎসক প্রথমে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া ভাববেন। কারণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরিকাঠামো এখনো অপর্যাপ্ত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারি নয়, কিন্তু সতর্কতাটুকু এখনই দরকার — না হলে নীরব ঘাতক হয়ে উঠতে দেরি হবে না।