উত্তরবঙ্গের চা বাগান ও গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যরক্ষায় দেবীস্বরূপা CHO
প্রতিবেদন—বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস, উত্তরবঙ্গ- উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স, তরাই ও দার্জিলিং-সহ ভারতের বিভিন্ন চা বাগান ও গ্রামীণ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি বড় সমস্যা। অপুষ্টি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার, সংক্রামক রোগ এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোর অভাব সেখানে সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উঠে এসেছেন Community Health Officer (CHO)-রা।
প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তাঁরা। বিশেষ করে চা বাগান ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে CHO-দের ভূমিকা এখন অনস্বীকার্য।
Community Health Officer (CHO) হলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীনে নিযুক্ত প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা মূলত Health and Wellness Centre (HWC)-এ কর্মরত। MLHP (Mid Level Health Care Provider) নামেও পরিচিত এই স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং উচ্চস্তরের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া।

CHO পদে নিয়োগের জন্য সাধারণত GNM (General Nursing and Midwifery), B.Sc. Nursing অথবা Post Basic B.Sc. Nursing ডিগ্রি প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি Indian Nursing Council অথবা State Nursing Council-এ নিবন্ধন এবং Certificate in Community Health (CCH)-সহ বিশেষ প্রশিক্ষণও আবশ্যিক।
একজন দক্ষ CHO-র মধ্যে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা, NCD Screening, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পোর্টাল ব্যবহারের ক্ষমতা, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, Telemedicine পরিষেবা পরিচালনার দক্ষতা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার যোগাযোগ ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
চা বাগান ও সংলগ্ন গ্রামীণ অঞ্চলে বহু শ্রমিক ও কৃষক প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেন। সেখানে শারীরিক দুর্বলতা, জ্বর, সর্দি-কাশি, চর্মরোগ ও রক্তাল্পতার মতো সমস্যা খুবই সাধারণ। CHO-রা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করেন।
সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও তাঁদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা এবং করোনা মহামারির সময়ে CHO-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, টেস্ট করানো ও সচেতনতা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করছেন তাঁরা। দারিদ্র্য, অতিরিক্ত শ্রমের চাপ ও পারিবারিক সমস্যার কারণে বহু শ্রমিক মানসিক অবসাদে ভোগেন। CHO-রা তাঁদের কাউন্সেলিং করেন এবং প্রয়োজন হলে উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেফার করেন।
বর্তমানে CHO-দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল NCD (Non-Communicable Disease) Screening বা অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক নির্ণয়। চা বাগান ও গ্রামীণ অঞ্চলে বিশেষ করে ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, COPD, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং Oral, Breast ও Cervical Cancer-এর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে।
CHO-রা নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, BMI-সহ বিভিন্ন পরীক্ষা করে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করেন। প্রয়োজন হলে রোগীদের উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানো হয়।

বর্তমান স্বাস্থ্যনীতিতে CHO-রা “Womb to Tomb Care” ধারণা অনুসরণ করেন। অর্থাৎ মাতৃগর্ভ থেকে জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্য, ANC ও PNC পরিষেবা, নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে সচেতনতা, পুষ্টি ও টিকাকরণ, নবজাতকের পরিচর্যা, শিশুদের পূর্ণ টিকাকরণ, অপুষ্টি প্রতিরোধ, কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের পর্যবেক্ষণ।
CHO-দের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবা ও অনলাইন রিপোর্টিং ব্যবস্থা। বর্তমানে তাঁরা গর্ভবতী মায়েদের তথ্য, শিশুর টিকাকরণ, NCD রোগীদের তালিকা, স্বাস্থ্য শিবিরের রিপোর্ট এবং রোগ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনলাইন পোর্টালে নথিভুক্ত করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
দূরবর্তী চা বাগান ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই ক্ষেত্রে Telemedicine পরিষেবা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। CHO-রা রোগীর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে অনলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। এর ফলে রোগীরা দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পান এবং সময় ও অর্থ—দু’টিই সাশ্রয় হয়।
স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন CHO-রা। নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবির, সচেতনতা সভা ও প্রচার অভিযানের মাধ্যমে তাঁরা পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, স্যানিটেশন, ধূমপান বিরোধী প্রচার এবং রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তুলছেন।

ডুয়ার্স, তরাই ও দার্জিলিংয়ের বহু চা বাগান এবং গ্রামীণ এলাকা দুর্গম হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক সময় সম্ভব হয় না। সেই পরিস্থিতিতে CHO-রাই সাধারণ মানুষের কাছে প্রথম স্বাস্থ্য সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এখন অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে।
তবে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় CHO-দের। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল পরিষেবার সমস্যা, দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের অসুবিধা, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং পরিকাঠামোগত ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
তার পরেও চা বাগান ও সংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকাগুলিতে স্বাস্থ্যরক্ষায় CHO-দের অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ডিজিটাল রিপোর্টিং, Telemedicine এবং NCD Screening-এর মাধ্যমে তাঁরা গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। “Womb to Tomb Care” ধারণাকে বাস্তবায়িত করে সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ভবিষ্যতে আরও উন্নত পরিকাঠামো ও সরকারি সহায়তা পেলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবেন CHO-রা।
